পর্যটন

মো: কামরুল ইসলাম মো: কামরুল ইসলাম
মহাব্যবস্থাপক-জনসংযোগ, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স

বিমান পরিচালন ব্যবসায় দুর্দিন

মোঃ কামরুল ইসলাম
মোঃ কামরুল ইসলাম

বিমান সংস্থায় হিউম্যান রিসোর্সের ব্যয় মেটাতে পৃথিবীর অনেক এয়ারলাইন্সকেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। কোনো এয়ারলাইন্স তার অপারেশন কস্ট বা ব্যবসার খরচ কমানোর উদ্যোগ নিলে প্রথমেই কর্মী ছাঁটাই করতে দেখা যায়, দেখা যায় বেতন কাঠামোয় পরিবর্তন আনতে, অর্গানোগ্রামকে পুনর্বিন্যাস করতে।

বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া করোনা মহামারির সময় বিষয়টি বেশি স্পষ্ট হয়েছে। লকডাউনের সময় সবার আগে যে খাত ক্ষতিগ্রস্ত হলো তা এভিয়েশন, ট্যুরিজম এন্ড হোটেল ইন্ডাস্ট্রি। এই ইন্ডাস্ট্রিকে টিকিয়ে রাখার জন্য নানাবিধ উপায়ে কস্ট কার্টেল করে অক্সিজেন সরবরাহের চেষ্টা করা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে এভিয়েশন অ্যান্ড ট্যুরিজম ইন্ডাস্ট্রি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখনো স্বাভাবিকতা আসেনি।

সব শিল্পের গতিশীলতা তখনই বজায় থাকবে, যখন আকাশপথের গতিশীলতা বজায় থাকবে। এই আকাশ পথকে সচল রাখতে আকাশ পরিবহনকে বাঁচিয়ে রাখতে বিভিন্ন দেশ করোনার দিনগুলোতে এভিয়েশন এন্ড ট্যুরিজম ইন্ডাস্ট্রিকে নানাভাবে প্রণোদনা দিয়ে, বিভিন্ন ধরনের চার্জ বিশেষ করে এ্যারোনোটিক্যাল ও নন-এ্যারোনোটিক্যাল চার্জ মওকুফ করে ইন্ডাস্ট্রিকে সচল রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে গেছে। কিন্তু বাংলাদেশের এভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রি বিশেষ করে প্রাইভেট এয়ারলাইন্সগুলো আসলে কতটুকু সহায়তা পেয়েছিলো তা ভাবনার বিষয়।

প্রণোদনা বলতে যা বোঝায় তা ছিলো জাতীয় বিমান সংস্থার জন্য। কোনো ধরনের চার্জ মওকুফ তো দূরের কথা; উল্টো যাত্রীদের ওপর এয়ারপোর্ট ডেভেলপমেন্ট ফি, এয়ারপোর্ট সিকিউরিটি ফি নামে নতুন নতুন চার্জ আরোপ করা হয়েছে। যা দিন শেষে যাত্রীদের ভাড়ার ওপর সরাসরি প্রভাব বিস্তার করে।

উড়োজাহাজের জন্য জেট ফুয়েল সরবরাহকারী একমাত্র প্রতিষ্ঠান, যা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন নিয়ন্ত্রিত পদ্মা অয়েল কোম্পানি।সরকারি প্রতিষ্ঠান কিন্তু সর্বদাই লাভ-লস বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। অথচ মূল লক্ষ্যই হওয়া উচিত একটি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠা। সেখানে বিপরীতচিত্রই ফুটে উঠছে প্রতিনিয়ত।

বাংলাদেশের ইতিহাসে এখন জেট ফুয়েলের রেকর্ড মূল্য বিরাজ করছে। অভ্যন্তরীণ রুটে ফ্লাইট পরিচালনার জন্য এয়ারলাইন্সকে প্রতি লিটার জেট ফুয়েলের মূল্য দিতে হয় ১১১ টাকা আর আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট পরিচালনার জন্য জেট ফুয়েল বাবদ প্রতি লিটারে খরচ করতে হয় ১.০৯ ডলার।

এখানেও চরম বৈষম্য। অভ্যন্তরীণ রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করছে দেশীয় এয়ারলাইন্স এবং ৯৫ শতাংশ বেশি যাত্রীই হচ্ছে বাংলাদেশি নাগরিক। অথচ এই অভ্যন্তরীণ রুটেই অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হচ্ছে দেশীয় এয়ারলাইন্স ও বাংলাদেশি নাগরিকদের!

একটি এয়ারলাইন্সের যেকোনো রুটের অপারেশনাল কস্টের প্রায় ৪০%-৪৬% খরচই বহন করতে হয় জেট ফুয়েল খরচ বাবদ। অথচ এই করোনা মহামারির সময় থেকে এখন পর্যন্ত গত ১৯ মাসে প্রায় ১৪১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে জেট ফুয়েলের মূল্য। ফ্লাইট পরিচালনার জন্য জেট ফুয়েলের জন্য প্রতি লিটারে প্রায় ১১ থেকে ১২ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে অভ্যন্তরীণ রুটে চলাচলকারী দেশীয় এয়ারলাইন্সকে।

দেশের বেসরকারি এয়ারলাইন্স ও জাতীয় বিমান সংস্থার মধ্যে বেশ কিছু অসামঞ্জস্য দেখা যাচ্ছে বছরের পর বছর। রাষ্ট্রীয় সংস্থা হিসেবে যেকোনো খারাপ সময়ে রাষ্ট্র পাশে এসে দাঁড়ায় অথচ বেসরকারি এয়ারলাইন্সগুলো সব সময় সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। কয়েক বছর আগে রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থার প্রায় ১৭০০ কোটি টাকা দেনা থেকে দায়মুক্তি দিয়েছিলো অথচ সেই সময়ে ব্যবসায় টিকে থাকতে না পেরে বিভিন্ন বেসরকারি বিমান-সংস্থা কার্যক্রম বন্ধ করে ব্যবসা গুটিয়ে চলে যেতে বাধ্য হয়।

বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থার কাছে পদ্মা অয়েল কোম্পানি প্রায় ২০০০ কোটি টাকা এবং সিভিল এভিয়েশন অথরিটি বিভিন্ন চার্জ বাবদ প্রায় ৪০০০ কোটি টাকার বেশি পাওনা। এই সংবাদ মাধ্যমগুলোতেই আবার রাষ্ট্রয় বিমানসংস্থার বিভিন্ন অর্থ বছরে লাভের হিসাব দেখা যায়। এই ধরনের হিসাবে কি লাভ হয় নাকি আয় হয় তা কোনোভাবেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে না।

উড়োজাহাজের বিভিন্ন রুটের ভাড়ার ব্যাপারে একটি উদাহরণ দেয়া যেতে পারে, ১৯৯৯ কিংবা ২০০০ সালে জেট ফুয়েলের মূল্য ছিলো প্রতি লিটার প্রায় ২৫ সেন্ট, কিংবা ১৪ টাকা; তখন ডলারের বিনিময়-মূল্য ছিলো প্রায় ৫০ টাকা, তখন ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের সর্বনিম্ন ভাড়া ছিলো প্রায় ৩০০০ টাকা। তৎকালীন সময়ে এ্যারোনোটিক্যাল ও নন-এ্যারোনোটিক্যাল চার্জসহ অন্যান্য চার্জ বর্তমানের তুলনায় এক তৃতীয়াংশ ছিলো আবার বাংলাদেশের পার ক্যাপিটা ইনকাম ছিলো ১০০০ ডলারের কম।

আর এখন জেট ফুয়েলের মূল্য প্রায় ১১১ টাকা, পার ক্যাপিটা ইনকাম প্রায় ২৭০০ ডলার, এ্যরোনোটিক্যাল ও নন-এ্যরোনোটিক্যাল চার্জসহ অন্যান্য চার্জ পূর্বের তুলনায় প্রায় তিনগুণ অথচ ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের মিনিমাম ভাড়া ৪৫০০টাকা।

তারপরও একটি কথা হরহামেশা বলা হয়, এয়ারলাইন্সগুলোর ভাড়া অনেক বেশি। এয়ারলাইন্সগুলোর আয়ের সঙ্গে যদি খরচের খুব বেশি তারতম্য দেখা যায়, তখন ব্যবসা গুটিয়ে দিতে বাধ্য হয়। গত ২৫ বছরে বাংলাদেশের এভিয়েশন সেক্টরে বিশেষ করে প্রাইভেট এয়ারলাইন্সের ৮ থেকে ৯টি এয়ারলাইন্স এভাবে ব্যবসা বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে।

নাইন ইলেভেন কিংবা করোনা মহামারির কারণে এভিয়েশন সেক্টরে নানাবিধ খরচের অবতারণা ঘটে। স্বাস্থ্যবিধি মানতে আসন সংখ্যা সীমিতকরণ, রেগুলেটরি অথরিটির নির্দেশনাসহ বিভিন্ন কারণে অপারেশন কস্টের আস্ফালন ঘটে। অথচ আয়ের পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। আয় আর ব্যয়ের মধ্যে চরম বৈষম্য দেখা দেয়।

এয়ারলাইন্সগুলো সাধারণত কোনো উৎসবকে সামনে রেখে ভাড়ার তারতম্য ঘটায় না। বাংলাদেশে ঈদ-উল ফিতর কিংবা ঈদ উল আযহা কিংবা বিভিন্ন জাতীয় দিবসকে সামনে রেখে যাত্রীদের আকাশপথ ব্যবহারের আধিক্য দেখা যায়। অনেক যাত্রী সেই সব দিবসকে সামনে রেখে অনেক আগে থেকেই ভ্রমণের পরিকল্পনা সাজিয়ে টিকিট সংগ্রহ হরে নেয়, ফলে কম ভাড়ায় ট্রাভেল করে থাকে। একই সময়ে ট্রাভেল করার জন্য শেষ সময়ে এসে অনেকে ট্রাভেল করার পরিকল্পনা সাজিয়ে থাকে, ফলে ভাড়ার ক্ষেত্রে তারতম্য ঘটে থাকে। তখনই যাত্রীদের কাছে মনে হয় এয়ারলাইন্সগুলো অতিরিক্ত ভাড়া নিচ্ছে। আরেকটি বিষয় উল্লেখ না করলেই নয়, সাধারণত ঈদের সময় একদিকে যাত্রীদের চাপ থাকে, যখন ভাড়া ক্যালকুলেশন করা হয়, তখন সেই বিষয়টিকেও মাথায় রেখে অপারেশন কস্ট বিবেচনায় ভাড়া নির্ধারণ করা হয়।

সারা বছর যেখানে প্রায় ৮০ শতাংশ যাত্রী নিয়ে এয়ারলাইন্সগুলো যাতায়াত করে সেখানে এয়ারলাইন্সগুলো ঈদের সময় বিভিন্ন গন্তব্যে গড় যাত্রী থাকে ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ। ওয়ান ওয়ে ট্রাফিক থাকার কারণে গড় যাত্রী কম হয়ে থাকে এ সময়।

এয়ারলাইন্স পরিচালনার ব্যয় আর আয়ের এমন বৈষম্যের কারণে বাংলাদেশের বেসরকারি বিমান সংস্থাগুলোর এখন টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়েছে। খরচের খাতগুলো যাতে অযাচিতভাবে এভিয়েশন ব্যবসায় প্রভাব বিস্তার করতে না পারে সেদিকে কঠোরভাবে দৃষ্টিপাত করা উচিত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।

লেখক: মহাব্যবস্থাপক-জনসংযোগ

ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স

দেশটিভি/এএম
দেশ-বিদেশের সকল তাৎক্ষণিক সংবাদ, দেশ টিভির জনপ্রিয় সব নাটক ও অনুষ্ঠান দেখতে, সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল:

এছাড়াও রয়েছে

ঢাকা-কলকাতা রুটে ফ্লাইট বাড়াচ্ছে ইউএস-বাংলা

দেশের এয়ারলাইন্স ব্যবসার কলকাঠি কার কাছে?

অপরূপ সিলেটে প্রস্ফুটিত পর্যটন

ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা তুলে নিল জাপান

ঢাকা থেকে দার্জিলিং : মিতালি এক্সপ্রেস ট্রেনের ভাড়া কত?

দেশ টিভির আনোয়ারসহ ১৪ সাংবাদিক পেলেন বিটিইএ সংবর্ধনা

বিদেশি পর্যটকদের জন্য ২১ ফেব্রুয়ারি সীমান্ত খুলছে অস্ট্রেলিয়া

তেঁতুলিয়া থেকে দেখা যাচ্ছে কাঞ্চনজঙ্ঘা

সর্বশেষ খবর

শীতার্তদের মাঝে কম্বল বিতরণ করলেন মোস্তাফিজুর রহমান

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ইউল্যাব’ শিক্ষার্থীদের ফটোওয়াক

ভান্ডারিয়া ও মঠবাড়িয়ায় পৌর প্রশাসক নিয়োগ

এক্সিম ব্যাংক কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ওরিয়েন্টেশন অনুষ্ঠিত