মতামত

অজয় পাল অজয় পাল
সাংবাদিক

স্পিকার, আপনার স্মৃতি হৃদয় থেকে কোনোদিনও ম্লান হবে না

অজয় পাল, সাংবাদিক
অজয় পাল, সাংবাদিক

আশির দশকে সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রতিষ্ঠার পর আমার প্রিয়জনদের অন্যতম ইয়ামিন চৌধুরী বীরবিক্রম একদিন সন্ধ্যায় সদ্য নির্মিত মিনারটি দেখাতে নিয়ে এসেছিলেন সিলেটের বরেণ্য ব্যক্তিত্ব হুমায়ূন রশীদ চৌধুরীকে। তখন তিনি সিলেট -১ আসনের জাতীয় পার্টি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য এবং একই সাথে পালন করছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব। সে ভিন্ন প্রসঙ্গ।

সন্ধ্যায় ইয়ামিন চৌধুরীর আমন্ত্রণে-ই আমিও শহীদ মিনারে গিয়েছিলাম। সেদিন শহীদ মিনার চত্বরে-ই হুমায়ুন রশিদ চৌধুরীর সাথে প্রথম আমাকে সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন ইয়ামিন চৌধুরী। আমার দুর্ভাগ্য, সেই পরিচয়কে পরবর্তি সময়ে আর ঝালিয়ে নেয়ার সুযোগ হয়নি। এভাবেই দিন গড়াতে থাকে। ইতোমধ্যে আবারও তাঁর সাথে মুখোমুখি হবার সুযোগ ঘটে যায় সিলেট স্টেশন ক্লাবের শতবর্ষ পূর্তি অনুষ্ঠানে। এবারও মাধ্যম সেই ইয়ামিন চৌধুরী। সেদিনের অনুষ্ঠানে হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী দরাজা কন্ঠে চমৎকার রবীন্দ্র সংগীত গেয়ে শ্রোতাদের মুগ্ধ করেন।

সময় আরো গড়িয়ে যায়। এরই মধ্যে পতন ঘটে এরশাদ সরকারের। আওয়ামীলীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার আমন্ত্রণে এবার তিনি আওয়ামী লীগে যোগদান করে সিলেট -১ আসন থেকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন ১৯৯৬ সালে। ঠিক এই সময়টাতেই আমি যথা সম্ভব তাঁর নির্বাচনী প্রচারণা অনুসরণের পাশাপাশি দীর্ঘ সাক্ষাৎকারও নিজের পত্রিকার জন্য গ্রহণ করে পাঠক সম্মুখে নিয়ে এলে আমাকে তিনি অনেকটা-ই তাঁর আস্থার মানুষ হিসেবে ভাবতে শুরু করেন বলেই আমার মনে হয়েছিলো।

এই নির্বাচনে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হবার পর তিনি জাতীয় সংসদের স্পিকার নির্বাচিত হন। এরপর দীর্ঘদিন আর তাঁর সান্নিধ্য লাভের সুযোগ হয়ে ওঠেনি। এখানে একটি বিষয় উল্লেখ না করলেই নয় , সিলেটের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে দুটি স্রোতধারা ছিলো বহমান। একটির নেতৃত্বে ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা আব্দুস সামাদ আজাদ এবং অপর স্রোতে ছিলেন হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী ও সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত।

 হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী

হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী

সামাদ আজাদের সাথে সত্তরের দশক থেকেই ছিলো আমার মধুর সম্পর্ক। সঙ্গত কারণেই সাংবাদিক হিসেবে কখনো সামাদ আজাদ বিষয়ে আমার কাগজে একটু বেশি লেখালেখি হলে অপর পক্ষ মনক্ষুণ্ণ হতো। ভীষণ বিব্রতকর অবস্থায় ছিলাম আমি। এরই মধ্যে ঘটে গেলো সিলেটে অত্যাধুনিক রেলওয়ে স্টেশন নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন নিয়ে দু'পক্ষের মধ্যে হুলুস্থুল ঘটনা।

সিলেট উন্নয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী সামাদ আজাদকে উপেক্ষা করে রাতের অন্ধকারে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করলেন হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী। সংবাদপত্রে এনিয়ে চলতে থাকে দু'পক্ষের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য। বিষয়টি শেখ হাসিনার কানে পর্যন্ত পৌঁছে যায়। আমি তখন বাংলাবাজার পত্রিকায় কর্মরত এবং সিলেট প্রেস ক্লাবের সহ-সভাপতি।

বৃহত্তর সিলেটে তখন বাংলাবাজার পত্রিকার সার্কুলেশন ছিলো শীর্ষে। আমার যেকোনো রিপোর্ট তখন পাঠককূলে প্রভাব ফেলতো। আমি তাই দুইপক্ষকে ব্যালেন্স করেই রিপোর্ট করতাম। আর তা সত্ত্বেও একটি পক্ষ বরাবরই মনে করতো আমি সামাদ আজাদ বলয়ের মানুষ। সামাদ আজাদ আমার পছন্দের মানুষ হতেই পারেন, এর অর্থ এই নয় যে, আমি তাঁর অনুকূলেই যা খুশি লিখে যাবো। সেটাতো হতেই পারে না। আর এমনটি হয়নিও কখনো।

এদিকে, আমাকে চমকে দিয়ে ২০০১ সালের গোড়ার দিকে ঢাকাস্থ ইউএনডিপি কার্যালয় থেকে একটি বার্তা পাঠানো হলো যে, কিউবার হাভানায় অনুষ্ঠিতব্য ৩১তম ইন্টার পার্লামেন্টারি কনভেনশন জাতীয় সংসদের একটি প্রতিনিধি দল অংশ নেবে। জাতীয় সংসদ সচিবালয় সেই দলে সাংবাদিক প্রতিনিধি হিসেবে বাংলাবাজার পত্রিকার সম্পাদক মো. জাকারিয়া খান এবং আমার নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই সফরে কেবলমাত্র দুইজন সাংবাদিকেরই অর্থায়ন করবে ইউএনডিপি।

এই বার্তায় আমাকে ভিসা সংগ্রহের জন্য দ্রুত পাসপোর্ট ঢাকায় পাঠানোর পরামর্শও দেয়া হয়। হঠাৎ আমার মতো একজন নগন্য সাংবাদিকের প্রতি জাতীয় সংসদ সচিবালয় কেনো এতো সদয় হলো আমি বুঝতেই পারছিলাম না। তবে ইতোমধ্যেই খবর পেয়ে যাই যে , স্পিকার হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী আমাদের দুই সাংবাদিকের নাম চূড়ান্ত করেছেন।

শেষমেষ আমি একটি সূত্র মারফত স্পিকারের কাছে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে সফরের প্রস্তুতি নিতে শুরু করি। এদিকে পরের সপ্তাহে-ই স্পিকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী সিলেট প্রেসক্লাবের একটি অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগদান করেন। প্রেসক্লাব সভাপতির অবর্তমানে আমি-ই অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করছিলাম। আমার বাম পাশে উপবিষ্ট হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী নিজে যেচেই হঠাৎ করে আমার কাছে জানতে চাইলেন, " হাভানা যাচ্ছেন তো ' ? বিনয়ের সাথে বললাম, হ্যাঁ যাচ্ছি। বললেন , ঘুরে আসুন, চমৎকার দেশ।

বললাম, এই সফরের সুযোগ করে দেয়ায় আপনার কাছে আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। বললেন, ফিরে এসে ঢাকায় সংসদ ভবনে দেখা করবেন। যথারীতি হাভানা থেকে ফিরে এসে আমার বড় ছেলে অতনু-কে নিয়ে সংসদ ভবনে দেখা করতে যাই। সেদিন স্পিকারের কার্যালয়ে গিয়ে পেয়ে যাই মেয়র বদর উদ্দিন আহমদ কামরান ও আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল খালিক মায়ন-কে। বিভিন্ন প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনার এক পর্যায়ে ২০০১ সালের আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বিষয়টি উঠে আসে। আলোচনার এক পর্যায়ে মেয়র কামরান হঠাৎ করেই স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললেন , " লিডার , আমাদের অজয়দা বহু নির্বাচনে প্রধান নির্বাচনী কার্যালয়ে মূখ্য ব্যক্তি হিসেবে সুচারুভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

অভিজ্ঞতায় একেবারেই ঝদ্ধ। আমি চাইছি , আপনার নির্বাচনে অজয়দা এবার সেই দায়িত্ব পালন করবেন। এ বিষয়ে স্পিকার কিছু বলার আগেই আব্দুল খালিক মায়ন বললেন, উত্তম প্রস্তাব লিডার। এই মানুষটি দায়িত্ব নিলে আপনার প্রচার প্রচারণাসহ সব কাজ সাবলীল গতিতে চলবে।

এবার মুখ খুললেন স্পিকার। বললেন, আপনারাতো বলেই যাচ্ছেন, অজয় বাবু তো মুখ খুলছেন না। এবার আমার পালা। বললাম, আমি আপনার পাশে আছি। স্পিকার বললেন, অনেক অনেক ধন্যবাদ।

নির্বাচনের আগেই সিলেটে আমার যতো উন্নয়ন কার্যক্রম , সবকিছু দিয়ে একটি সচিত্র পোস্টার বের করতে হবে । আমি সবকিছু বুঝে নিয়ে সিলেটে ফিরে এলাম। ফিরে আসার পর নাইওরপুল নিবাসী আমার বন্ধু হাজী আব্দুল মতিন আমার সাথে যোগাযোগ করলেন।

জানালেন , স্পিকার নাকি তাকে পোস্টার বের করার ব্যাপারে আমাকে সার্বিক সহযোগিতা করতে বলেছেন। হাজী আব্দুল মতিনের অর্থায়নে আমরা দুইজনে মিলে বের করলাম সচিত্র পোস্টার। কিছুদিনের মধ্যেই ফের সিলেটে এলেন স্পিকার। মেয়র বদরুদ্দিন আহমেদ কামরান, হাজী মতিন ও আমি মুদ্রিত পোস্টারের কয়েকটি কপি নিয়ে স্পিকারের সাথে দেখা করলাম।

পোস্টারে এক নজর চোখ বুলিয়েই স্পিকার মুগ্ধতা ছড়িয়ে বললেন, 'চমৎকার চমৎকার " । শুধু তাই নয়, আরো বললেন, আপনাদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ।

এদিনই সন্ধ্যায় স্পিকার ফিরে গেলেন ঢাকায়। সম্ভবত তারিখটি ছিল ২০০১ সালের ২৬ জুন। এরপর এই মানুষটির সাথে আর দেখা হয়নি , হয়নি কোনো যোগাযোগও । মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে একই সালের ১০ জুলাই তিনি চলে গেলেন না ফেরার দেশে।

না হলো তাঁর আর নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা , না হলো এই মানুষটির সাথে আমার ফের দেখা, পড়ে রইলো কেবল স্মৃতির অনুসঙ্গ হয়ে সব মুদ্রিত পোস্টার। অবশ্য তাঁর মৃত্যুর পরেও বন্ধু মতিন নিজের উদ্যোগে এসব পোস্টার শহরে লাগানোর ব্যবস্থা করেছিলেন।

আমার কষ্টের জায়গাটা এখানেই, খুব বেশিদিন এই উজ্জ্বল ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষটির সান্নিধ্য লাভের সুযোগ আমার হয়ে উঠেনি। অল্প যে ক'দিন তাঁর সান্নিধ্য পেয়েছি, তাঁর ব্যবহার, জ্ঞান-প্রজ্ঞা এবং প্রতিটি মানুষকে আপন করে নেয়ার অসাধারণ ক্যারিসমা দেখে আমি বিমুগ্ধ হয়েছি বারবার।

স্পিকার, আপনার স্মৃতি হৃদয় থেকে কোনোদিনও ম্লান হবে না। পরপারে ভালো থাকুন অনন্তকাল।

দেশটিভি/এমএনকে
দেশ-বিদেশের সকল তাৎক্ষণিক সংবাদ, দেশ টিভির জনপ্রিয় সব নাটক ও অনুষ্ঠান দেখতে, সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল:

এছাড়াও রয়েছে

শারদীয় শুভেচ্ছা; সম্প্রীতির বন্ধন অটুট থাকুক

অদম্য এক দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক

শুভ জন্মদিন বিপন্ন মানবতার বাতিঘর শেখ হাসিনা

বাঙালির অনুপ্রেরণা: নির্মোহ শেখ রেহানা

বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে বর্বরোচিত ও কলঙ্কিত দিন ২১ আগস্ট

বহ্নিমান শোকের ১৫ আগস্ট

বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব: বঙ্গবন্ধুর শক্তি ও অনুপ্রেরণার নাম

সময় আর নিরাপত্তা সূচকে যাত্রীদের প্রথম পছন্দ আকাশপথ

সর্বশেষ খবর

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ইউল্যাব’ শিক্ষার্থীদের ফটোওয়াক

ভান্ডারিয়া ও মঠবাড়িয়ায় পৌর প্রশাসক নিয়োগ

এক্সিম ব্যাংক কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ওরিয়েন্টেশন অনুষ্ঠিত

সিলেটে ভোক্তা অধিদপ্তর ও সিসিএস-এর সচেতনতামূলক সভা