মতামত

বিভুরঞ্জন সরকার বিভুরঞ্জন সরকার
জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

হুমায়ূন আহমেদকে হারিয়ে দেওয়া, ছাড়িয়ে যাওয়া সহজ নয়

 বিভুরঞ্জন সরকার
বিভুরঞ্জন সরকার

(কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের প্রয়াণের পর পর লেখক এই লেখাটি লিখেছিলেন)

একটি জরুরি কাজে আটকে যাওয়ায় ধানমন্ডি থেকে সিদ্ধেশ্বরীর বাসায় ফিরতে ঘড়ির কাঁটা রাত এগারোটা পেরিয়ে যায়। সাড়ে এগারোটার দিকে টেলিভিশনের সুইচ টিপে কোনো একটি চ্যানেল অন করতেই স্ক্রলে চোখ আটকে গেল: ‘জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে নন্দিত কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ।’

বুকের ভেতরে কেমন যেন ধক্ করে উঠলো। চোখ দুটো বুঝি একটু ঝাপসা হয়ে এলো। আমি যে হুমায়ূন আহমেদের অনুরাগী পাঠক কিংবা তার খুব ভক্ত তা নই, তারপরও কেন যেন ভেতরটা কেমন হাহাকার করে উঠলো। এক ধরনের দুঃখবোধ আচ্ছন্ন করে ফেললো আমাকে। তাহলে কি সব আশাই শেষ হয়ে গেল? তিনি কি চলে গেলেন অজানা ভুবনে? মাত্র কয়েক মিনিট যেতে না যেতেই টিভি পর্দার স্ক্রলে ভেসে উঠলো সেই নিষ্ঠুর অথচ চিরন্তন সত্য-তিনি আর নেই। দু’চোখ থেকে দু’ফোটা অবাধ্য জল গড়িয়ে পড়লো। আহা, এই তো ক’দিন আগেই দেশে এসে প্রাণবন্ত একজন মানুষের মতো বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের সঙ্গে সাক্ষাৎকার দিয়ে কত আশা জাগানিয়া কথা বলেছেন। কোনো একটি পত্রিকায় পড়েছি জীবনের জন্য তার প্রবল আকুতি এবং জিজ্ঞাসা - একটি কচ্ছপ তিনশ’ বছর বেঁচে থাকে অথচ মানুষের আয়ু এত কম কেন? সত্যি তো, কত জটিল সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা কিন্তু ‘জীবন এত ছোট ক্যানে’-এর উত্তর তো পাওয়া যায়নি এখনো। জীবন এবং মৃত্যু এক বড় অনিশ্চয়তার খেলা।

হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত পরিচয় যতটুকু ছিল সেটা উল্লেখ করার মতো নয়। দু’একবার পেশাগত কারণে তার বাসা ধানমন্ডির দক্ষিণ হাওয়ায় গিয়েছি। কথা হয়েছে যথেষ্ট আন্তরিকতার সঙ্গেই। ফোনেও যোগাযোগ হয়েছে বার কয়েক। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবস্থায় তার ‘নন্দিত নরকে’ এবং ‘শঙ্খনীল কারাগার’ পড়ে যথেষ্ট মুগ্ধ ও উদ্দীপ্ত হয়েছিলাম। তার সম্পর্কে তখন বিশেষ আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। সেটা অবশ্য বেশি দিন টেকেনি। তবে তার কয়েকটি টিভি নাটক-এই সব দিনরাত্রি, বহুব্রীহি, অয়োময়, কোথাও কেউ নেই-আগ্রহ নিয়ে এবং মুগ্ধ হয়ে দেখেছি। বলা যায় তার নাটক দেখতে গিয়েই আমার টিভি দেখার অভ্যাস তৈরি হয়েছে। তবে পাঠাভ্যাস তাকে কেন্দ্র করে নয়। তার নির্মিত চলচ্চিত্র আগুনের পরশমণি, শ্যামল ছায়া, শ্রাবণ মেঘের দিন, দুই দুয়ারী, চন্দ্রকথা দেখেছি এবং ভালো লেগেছে। মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক উপন্যাস ‘জোছনা ও জননীর গল্প’, ‘১৯৭১’ পড়েছি উৎসাহ নিয়েই।

খ. হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্যকর্ম কিংবা নাটক বা সিনেমা নিয়ে আলোচনা করার যোগ্যতা আমার নেই। হুমায়ূন আহমেদ সম্পর্কে পাঠকদের কাছে নতুন কোনো তথ্যও আমি তুলে ধরতে পারবো না। হুমায়ূন আহমেদ সম্পর্কে, তিনি কতটি বই লিখেছেন, কয়টি নাটক ও চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন, তার ব্যক্তিগত জীবন, তার পরিবার-পরিজন, তার বিয়ে, বিয়ে বিচ্ছেদ, নতুন বিয়ে, ছেলে-মেয়ে, তার ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ ইত্যাদি সম্পর্কে পাঠকরা আমার চেয়ে বেশি জানেন। পুলিশ কর্মকর্তা তার বাবা ফয়জুর রহমান যে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হন, তা মা আয়েশা ফয়েজ তিন পুত্রকে ‘মানুষ’ করার জন্য কতটা জীবন সংগ্রাম করেছেন সে কথাও অজানা নেই কারো। তার দুই অনুজ উজ্জ্বল প্রতিভাধর ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল ও আহসান হাবীবও নিজ নিজ গুণেই পাঠকদের কাছে পরিচিত।

হুমায়ূন আহমেদ একজিন জনপ্রিয় লেখক। বড় ধরনের সেলিব্রেটি। ফলে তার ঘরের খবর থেকে শুরু করে তার বৈচিত্রময় কর্মকাণ্ডের খবর, তাকে নিয়ে নানা কথা-কাহিনী সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে, পাঠকরা তা পড়েছেন। তিনি যে দেশের এক বিশাল জনগোষ্ঠীকে বইমুখী করেছেন অর্থাৎ একটি বড় পাঠকশ্রেণি তৈরি করেছেন, দেশের প্রকাশনা শিল্প যে তার হাত ধরে নতুন মাত্রা পেয়েছে, পাঠকদের কলকাতা-নির্ভরতা কমাতেও যে তার বড় অবদান, টেলিভিশন নাটককে জনপ্রিয় করা, মধ্যবিত্ত ও রুচিবান দর্শকদের বাংলাদেশের চলচ্চিত্র দেখতে আগ্রহী করে তোলা - এসব ক্ষেত্রে তিনি একাই পালন করেছেন অনেকের ভূমিকা।

তিনি যে অত্যন্ত বন্ধুবৎসল ছিলেন, বন্ধুদের আড্ডায় তিনিই যে থাকতেন মধ্যমণি, অনেক সিরিয়াস কথাও যে তিনি খুব সহজভাবে মজা করে বলতে পারতেন, তাকে দেখে বাইরে থেকে যতটা গম্ভীর মনে হতো আদতে তিনি যে তেমন ছিলেন না, ছিলেন কৌতুক প্রিয় এবং কিছুটা খেয়ালি স্বভাবের- এ সব কথাও এখন আর কারো অজানা নয়। তার সৃষ্ট অসাধারণ চরিত্র মিসির আলী কিংবা হিমুর কথা কার না জানা! তারপরও তাকে নিয়ে কিছু লেখার ইচ্ছা কিংবা বলা যায় লোভ সংবরণ করতে পারলাম না। কিছু মানুষের এমন জাদুকরী প্রভাব থাকে যা অন্যকে ছুঁয়ে যায়, স্পর্শ করে, কাছে টানে, ইচ্ছে করলেও তাদের এড়িয়ে যাওয়া যায় না। হুমায়ূন আহমেদও সম্ভবত সে রকমই একজন।

গ. আড়েঠাড়ে কেউ কেউ এমনটা বলার চেষ্টা করেন যে, হুমায়ূন আহমেদ মধ্যবিত্তের সেন্টিমেন্টকে কৌশলে কাজে লাগিয়ে পাঠকদের এক্সপ্লয়েন্ট করেছেন। তিনি মূলত টিনএজদের জন্য লিখেছেন। তার লেখা এক নিঃশ্বাসে যেমন পড়া যায়, তেমনি ভুলেও যাওয়া যায় দ্রুত। পড়তে মজা লাগে কিন্তু মনে স্থায়ী গভীর কোনো রেখাপাত করে না। হতে পারে, ঋদ্ধ পাঠকদের কথা মনে রেখে তিনি লেখেননি, কিন্তু যাদের জন্য লিখেছেন তারা তো তার লেখা গ্রহণ করেছে, ভীষণভাবেই করেছে। সবাই শিল্প-সাহিত্য সৃষ্টি করবেন উচ্চমার্গের পাঠক-দর্শক-শ্রোতার জন্য সেটাইবা কেমন কথা। সাধারণ মানুষদের অবহেলা-উপেক্ষা করার কথা আমরা প্রায়ই বলে থাকি, তাদের জন্য শিল্প-সাহিত্যদের দুয়ার যদি কেউ উদারতার সঙ্গে খুলে দেন তাহলে তো দোষের কিছু নেই। বরং এটা তো একটা বড় গুণ। হুমায়ূন আহমেদ ভান-ভনিতা না করে শিল্প-সাহিত্যের পথে হেঁটেছেন, পথটা তৈরি করে নিয়েছেন নিজেই। এখানেই তিনি বিশিষ্ট, অনন্য। তার সৃষ্টিকর্ম কালজয়ী কি-না, তার সাহিত্য তাকে কতটা অমর করবে, সেটা কি এখনই বিচার করার বিষয়? মধ্যবিত্তের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা নিয়ে অসাধারণ যে-সব চরিত্র নির্মাণ করে তিনি যে শক্তিমত্তার পরিচয় দিয়েছেন তা তুলনারহিত। বেশি লিখেছেন বলে সব লেখার মান ধরে রাখতে পারেননি - এমন কথা শোনা যায়। কিন্তু তার মতো উইট ও হিউমার আর কার লেখায় সন্নিবেশিত হয়েছে তা-কি কেউ বলতে পারবেন? সহজ কথা কঠিন করে বলা ভালো, নাকি কঠিন কথা সহজ করে বলাটাই বেশি ভালো?

ঘ. জাতি হিসেবে আমরা খুবই আবেগ ও উচ্ছ্বাসপ্রবণ। আতিশয্য বাঙালির এক বৈশিষ্ট। কারো নিন্দার ক্ষেত্রে যেমন আমরা নিষ্ঠুর তেমনি প্রশংসার ক্ষেত্রেও কখনো কখনো অকৃপণ। বিশেষত কেউ মারা গেলে তাকে নিয়ে আমাদের মাতামাতির শেষ থাকে না। হুমায়ূন আহমেদের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হবে না। তবে তিনি যেহেতু অসম্ভব জনপ্রিয় একজন মানুষ ছিলেন, যেহেতু দেশে-বিদেশে বাঙালি সমাজে রয়েছে তার বিরাট ভক্তকূল, সেহেতু তার মৃত্যুতে বড় ধরনের আলোড়ন হবে, মাতম হবে, এটা অপ্রত্যাশিত নয়। হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুর সংবাদ জেনে পশ্চিমবাংলার খ্যাতিমান সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, বলেছেন, আমি তো তাকে বলতাম, শরৎচন্দ্রের জনপ্রিয়তাকেও হার মানিয়েছো। সুনীলের এই মূল্যায়ন কারো কাছে অতিশয়োক্তি বলে মনে হতে পারে। তবে হুমায়ূন আহমেদের জনপ্রিয়তা যে অনেক আগেই ঈর্ষণীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে তা অস্বীকার করার উপায় নেই। হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্য কতটা কালোত্তীর্ণ সেটা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে, তার সাহিত্য কতটা উচ্চমানের সেটা নিয়ে বিদগ্ধ মহলে চলতে পারে জমাটি বিতর্ক, কিন্তু তার সাহিত্য যে তার বিপুল সংখ্যক পাঠকের মনে বিপুল নাড়া দিতে সক্ষম হয়েছে তা নিয়ে তো সন্দেহ প্রকাশ করতে পারবেন না কেউ।

ঙ. কোন কোন উপন্যাস বা অন্য কোন সৃষ্টি কর্মের জন্য হুমায়ূন আহমেদ পাঠকদের কাছে দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবেন, সেটা নির্দিষ্ট করে বলা হয়তো কঠিন। তবে তার একাধিক উপন্যাস, ছোট গল্প, সায়েন্স ফিকশন যে পাঠকদের বর্তমান সময় থেকে আরো অনেক সময় পরেও একইভাবে টানবে, নাড়া দেবে সেটা বলা যায় নিশ্চিত করেই। উপন্যাসের জন্য, নাকি নাটকের জন্য, নাকি চলচ্চিত্রের জন্য তিনি বেশি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন, সে সম্পর্কে চূড়ান্ত রায় দেওয়ার সময় এখনই নয়।

আমাদের একটি জাত-বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, কেউ সুনাম কুড়ালে তার গায়ে একটু দুর্নামের কালি লেপে দেওয়ার সুযোগ খোঁজা। ভাবটা এই রকম, ও আমাকে ছাড়িয়ে যাবে, দেখি না ওকে একটু হারিয়ে দিতে পারি কি-না! রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে তার সময়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করার লোকের অভাব ছিল না। এগুলো যে রবীন্দ্রনাথকে ব্যথিত করেনি তাও নয়। কারণ যত যাই হোক তিনি তো রক্তমাংসের মানুষই ছিলেন। আঘাত দিলে ব্যথা পায় না এমন শরীরী মানুষ পাওয়া যাবে কোথায়? হুমায়ূন আহমেদকে নিয়েও হাসি-তামাশা করার লোকের অভাব না থাকারই কথা। প্রসঙ্গত একটি ঘটনার কথা মনে পড়ছে। সম্ভবত আশির দশকের গোড়ার দিকের কথা। হুমায়ূন আহমেদের জনপ্রিয়তা তখন এখনকার মতো আকাশচুম্বী হয়ে ওঠেনি। তবে পাঠকপ্রিয়তা তিনি অর্জন করতে শুরু করেছেন এবং প্রকাশকের কাছ থেকে গাড়ি উপহার পেয়েছেন।

সে সময় একদিন নবাবপুর রোডের একটি প্রেসে হুমায়ূন আহমেদ এবং বাংলা সাহিত্যের আরেক ক্ষমতাধর লেখক অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদ নিজ নিজ গ্রন্থের প্রুফ সংশোধনের কাজ করছিলেন। আমিও ওই প্রেসে গিয়েছি একুশে সংকলন বা অন্য কোনো কিছু ছাপানোর কাজে। হুমায়ুন আজাদ বা হুমায়ূন আহমেদ কারো সঙ্গেই তখন আমার পরিচয় নেই। তবে চিনতাম দু’জনকেই। তারা দু’জন দুই টেবিলে বসে প্রুফ দেখছিলেন। আমি আরেকটি টেবিলে বসে আমার কাজ করছি। হুমায়ুন আজাদ হঠাৎ কিছুটা উচ্চস্বরে যেন আমার মনোযোগ আকর্ষণ করার জন্যই বললেন, আমাদের দেশে যে একজন ‘অপন্যাসিক’ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে, সেটা জানেন? আমি তার দিকে চোখ ফেরালাম কিন্তু আমার মুখে অজ্ঞতার ছাপ লক্ষ্য করে তিনি একটু দূরে বসে নীরবে পাণ্ডুলিপি সংশোধনে ব্যস্ত হুমায়ূন আহমেদের দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, ‘বালকরাই নাবালকদের জন্য লেখে’!

এ ধরনের মন্তব্য আমার ভালো লাগেনি। পরে অবশ্য হুমায়ুন আজাদ পত্রপত্রিকায় সাক্ষাৎকার দিয়ে প্রকাশ্যেই হুমায়ূন আহমেদকে ‘অপন্যাসিক’ বলে বিদ্রুপ করেছেন। হুমায়ুন আজাদ নিঃসন্দেহ প্রতিভাবান লেখক ছিলেন। তবে তিনি যেভাবে হুমায়ূন আহমেদের প্রতিভা নিয়ে উপহাস করেছেন, সেটা কাম্য ছিল না। কেবল হুমায়ুন আজাদ কেন -নিজের রচনার সাহিত্যমান নিয়ে একই ধারার সমালোচনা হুমায়ূন আহমেদকে আরো অনেকের কাছ থেকেই শুনতে হয়েছে। এসব সমালোচনা তাকে ব্যথিত করেনি, এমন দাবি কেউ করলে সেটা যথার্থ হবে না। কারো কটাক্ষ কিংবা বিরূপ সমালোচনায় বিচলিত না হয়ে তিনি কলম সচল রাখতে পেরেছিলেন বলেই জনপ্রিয়তায় সবাইকে ছাড়িয়ে যেতে পেরেছেন। তাকে ছোট করতে চেয়ে কেউ কিন্তু তার থেকে বড় হতে পারেননি।

চ. তিনি সৃজনশীলতার যে জায়গায় হাত দিয়েছেন (গান লিখেছেন, ছবিও এঁকেছেন, কবিতা লিখেছেন কি?) সেখানেই বিস্ময়কর প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। তবে আমার বিবেচনায় সব চেয়ে বড় যে কাজটি তিনি করেছেন, সেটা হচ্ছে পঁচাত্তর-পরবর্তী সময়ে শাসক গোষ্ঠী যখন আমাদের দেশের রাজনীতিকে পাকিস্তানি ধারায় ধাবিত করতে চেয়েছে, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বিকৃত করে, মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তিকে তথা রাজাকার-আলবদরদের রাজনীতিতে-সমাজে প্রতিষ্ঠিত করা শুরু করেছে তখন হুমায়ূন আহমেদ উপন্যাস, নাটক ও চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তার প্রতিবাদ করেছেন।

তিনি স্লোগানধর্মী রাজনৈতিক সাহিত্য রচনা করেননি বটে কিন্তু তরুণ পাঠকদের মনোভূমিতে তিনি তার সহজাত সরসভঙ্গিতে চেতনার যে বীজ বপণ করে দিয়েছেন, তার মূল্য অপরিসীম। তিনি তার রচনায় অন্ধতাকে প্রশ্রয় না দিয়ে যুক্তিবাদিতাকে প্রাধান্য দিয়েছেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানের (রসায়ন) শিক্ষক ছিলেন। তাই বলে তার কোনো লেখায় পাঠকদের ‘শিক্ষা’ দেওয়ার মতো কোনো কিছুর প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায়নি।

রবীন্দ্রনাথ যেমন বলেছেন, ‘অনেক কথা যাও যে বলে, কোনো কথা না বলে’, হুমায়ূন আহমেদের রচনাও যেন তেমনি ধাঁচের। কিছু না বলার ছলে অনেক কিছু বলেছেন। তার লেখার ঢং সিরিয়াস নয়, কিন্তু তা বলে বক্তব্য হালকা নয়। আমার বিবেচনায় তার লেখা পড়েই নতুন প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বেড়ে ওঠার শিক্ষা নিয়েছেন। তার লেখায় কদর্যতা নেই, নিষ্ঠুরতা নেই, আছে উদারতা, সরলতা, মানবিকতা। তিনি অনেককে, হাজার হাজার, লাখ লাখ পাঠককে নতুন করে মুক্তিযুদ্ধ চিনিয়েছেন, রাজাকারদের ঘৃণা করতে শিখিয়েছেন। যারা তাকে প্রবলভাবে, অন্ধভাবে ভালোবাসেন, তাদের প্রতি অনুরোধ: তার রচনাগুলো কেবল পড়তে ভালো লাগে, মজা লাগে বলে না পড়ে একটু সিরিয়াসলি পড়ুন।

যারা আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ভুলিয়ে দিতে চায়, দেশকে পাকিস্তানি ধারায় ফিরিয়ে নিতে চায় তাদের সম্মিলিতভাবে প্রতিরোধের ক্ষমতা অর্জন করার মধ্য দিয়েই হুমায়ূন আহমেদের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা জানানো সম্ভব হবে। কয়েকদিন তাকে নিয়ে মাতম করে, তিনি অমুক, তিনি তমুক ইত্যাদি বাগাড়ম্বর করে তারপর পাঠবিমুখ, যুক্তিবিমুখ হয়ে দিনযাপনের গতানুগতিকতায় চলতে থাকার মূঢ়তা যেন হুমায়ূনভক্তদের পেয়ে না বসে। আধুনিক ও পরিশীলিত মানুষ হিসেবে নিজেদের তৈরি করতে পারলেই হুমায়ূন-পাঠ সার্থক হবে।

দেশটিভি/এমএনকে
দেশ-বিদেশের সকল তাৎক্ষণিক সংবাদ, দেশ টিভির জনপ্রিয় সব নাটক ও অনুষ্ঠান দেখতে, সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল:

এছাড়াও রয়েছে

অদম্য এক দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক

শুভ জন্মদিন বিপন্ন মানবতার বাতিঘর শেখ হাসিনা

বাঙালির অনুপ্রেরণা: নির্মোহ শেখ রেহানা

স্পিকার, আপনার স্মৃতি হৃদয় থেকে কোনোদিনও ম্লান হবে না

বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে বর্বরোচিত ও কলঙ্কিত দিন ২১ আগস্ট

বহ্নিমান শোকের ১৫ আগস্ট

বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব: বঙ্গবন্ধুর শক্তি ও অনুপ্রেরণার নাম

সময় আর নিরাপত্তা সূচকে যাত্রীদের প্রথম পছন্দ আকাশপথ

সর্বশেষ খবর

পুলিশ প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নিলেন চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন

শিক্ষায় মানিকগঞ্জে শ্রেষ্ঠ উপজেলা চেয়ারম্যান রাজা

বিনিয়োগ বাড়াতে বাংলাদেশের পরিচিতি বাড়ানোর আহ্বান তুরস্কের

আট মাসে ৫৭৪ কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার