জাতীয়

নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক

বিশ্বব্যাংকের অভিযোগে বিন্দুমাত্র সত্য ছিল না: সৈয়দ আবুল হোসেন

সৈয়দ আবুল হোসেন
সৈয়দ আবুল হোসেন

পদ্মা সেতু নিয়ে বিশ্বব্যাংক যেসব অভিযোগ তুলেছিল, তাতে বিন্দুমাত্র সত্য ছিল না বলে জানিয়েছেন সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন। দেশ টিভিকে দেয়া দীর্ঘ এক সাক্ষাৎকারে সেই সময়কার নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন তিনি।

১. পদ্মা সেতু উদ্বোধন হতে যাচ্ছে, আপনার অনুভূতি কি?

উত্তর: আগামী ২৫ জুন ‘পদ্মা সেতু’ উদ্বোধন হতে যাচ্ছে। বাংলাদেশের মানুষের জন্য এটা খুশির খবর। আমার জন্যও আনন্দের খবর। পদ্মা সেতু বাংলাদেশের মানুষের স্বপ্ন। এই স্বপ্ন বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে রোপণ ও জাগ্রত করেছিলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সকল বাধা মোকাবিলা করেছেন। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন করেছেন। পদ্মা সেতু নির্মাণ করে নিজেদের সক্ষমতা, আন্তরিকতা, জন-অঙ্গীকার এবং সততার প্রতিফলন ঘটিয়েছেন। আমার ভালো লাগছে এই ভেবে যে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদ্মা সেতু নির্মাণ করে ষড়যন্ত্রকারীদের অপমানের প্রতিশোধ নিয়েছেন। পদ্মা সেতু নির্মাণ করে সকল ষড়যন্ত্রের জবাব দিয়েছেন।

আপনারা জানেন, আমি পদ্মা সেতু নির্মাণের প্রস্তুতি পর্যায়ে যোগাযোগ মন্ত্রী ছিলাম। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র এবং অপমানের তীর সরাসরি আমাকে আঘাত করেছিল। আমার কাজকে বিতর্কিত এবং আমার আন্তরিকতা ও সততাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছিল। অবশ্য পরবর্তীতে দুদকের তদন্ত ও কানাডার আদালতের রায়ে আমি নির্দোষ প্রমাণিত হই। ষড়যন্ত্রকারীদের ষড়যন্ত্র ও অপবাদ মিথ্যা প্রমাণিত হয়। আসলে ষড়যন্ত্রকারীদের উদ্দেশ্য ছিল: পদ্মা সেতুর নির্মাণ বিলম্বিত করা। দেশের মানুষের স্বপ্ন নষ্ট করা এবং আওয়ামী লীগ সরকারকে ব্যর্থ প্রমাণ করা।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তাদের ষড়যন্ত্র উপলব্ধি করেই সরকারের সততা ও আন্তরিকতা প্রদর্শনে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ করেছেন। পদ্মা সেতু নির্মাণের প্রস্তুতিপর্বে সরকার এবং যোগাযোগমন্ত্রী হিসেবে আমার যে কোন অনিয়ম ছিল না তা প্রমাণ করেছেন। এর মধ্য দিয়ে সরকার এবং যোগাযোগমন্ত্রী হিসেবে আমাদের সততা, আন্তরিকতা ও দায়িত্ববোধ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সামগ্রিকভাবে তাই আমি অত্যন্ত খুশি হয়েছি। পদ্মা সেতুর এ সাফল্য এককভাবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র ও ভিত্তিহীন অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত করে- আজকের পদ্মা সেতু দৃশ্যমান। এই সেতু দক্ষিণ এশিয়াসহ বিশ্বে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে। পদ্মা সেতু উদ্বোধনের প্রাক্কালে আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি অভিনন্দন ও কৃতজ্ঞতা জানাই।

২.আপনার বিরুদ্ধে পদ্মা সেতু নিয়ে অভিযোগ উঠেছিল- এ প্রসঙ্গে আপনার মন্তব্য কি?

উত্তরঃ আমার বিরুদ্ধে পদ্মা সেতু নিয়ে যে অভিযোগ উঠেছিল- তা ছিল ভিত্তিহীন, উদ্দেশ্যমূলক ও সম্পূর্ণ অসত্য। উদ্দেশ্য ছিল: পদ্মা সেতুর বাস্তবায়ন সময় দীর্ঘায়িত করা এবং স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা। সরকারের জন-অঙ্গীকার বাস্তবায়নে বাধার সৃষ্টি করা এবং সরকারকে ক্ষতিগ্রস্ত করা। আপনারা জানেন, দুই বছরে আমি পদ্মা সেতুর প্রস্তুতিকাজ শেষ করে এনেছিলাম। ভূমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসনসহ যাবতীয় আনুষঙ্গিক কাজ এবং মূল সেতুর দরদাতা প্রাক-যোগ্য নির্বাচন যথানিয়মে, বিশ্বব্যাংকের অনুমোদনে এগিয়ে এনেছিলাম। নিজস্ব অর্থায়নে ভূমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসন কাজে দাতাসহ সব মহল সন্তুষ্ট ছিল। শুধুমাত্র মূল সেতুর প্রাক-যোগ্য দরদাতা নির্বাচনে বিশ্বব্যাংকের একটি তদবির অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত টেকনিক্যাল কমিটি কার্যকর করতে অপারগতা প্রকাশ করার পরই বিশ্বব্যাংকের ধীরগতি পরিলক্ষিত হয় এবং আমার বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগ উত্থাপিত হয়।

বিশ্বব্যাংক টিইসি নির্বাচিত ৫টি প্রতিষ্ঠানের মধ্য থেকে প্রাক-যোগ্য দরদাতা China Constructioin Communication Company (CCCC)-কে বিশ্বব্যাংকের কালোতালিকাভুক্তির কারণে বাদ দিতে বলে এবং একটি প্রাক-যোগ্যতায় অযোগ্য দরদাতা China Railway Construction Company (CRCC)-কে Qualify করতে বলে। কারিগরি কমিটি প্রাক-যোগ্য কোয়ালিফাইড দরদাতাকে বিশ্বব্যাংকের তালিকাভুক্তির কারণে বাদ দেয়। কিন্তু প্রাক-যোগ্য ডিসকোয়ালিফাইড দরদাতাকে অভিজ্ঞতার জাল সার্টিফিকেট দেয়ায় কোয়ালিফাই করতে অস্বীকৃতি জানায়। ডিসকোয়ালিফাইড দরদাতাকে কোয়ালিফাই করার জন্য বিশ্বব্যাংক একাধিকবার তদবির করে। কিন্তু টিইসি তাকে যোগ্য করতে শেষাবধি অস্বীকৃতি জানায়। পরবর্তীতে বড় ধরনের জালিয়াতি ধরা পড়ার আশংকায় CRCC দরপত্র প্রত্যাহার করে নেয় এবং CRCC-কে যোগ্য করতে ব্যর্থ হওয়ার পরই বিশ্বব্যাংক এবং ঈজঈঈ’র স্থানীয় প্রতিনিধি আমার নামে মিথ্যা অভিযোগ উত্থাপন করতে থাকে এবং স্থানীয় মিডিয়ায় প্রচারের মাধ্যমে একটি অশুভ পরিস্থিতি সৃষ্টি করে।

পদ্মা সেতু নিয়ে বিশ্বব্যাংকের তথাকথিত দুর্নীতির অভিযোগ শুধু ভিত্তিহীন ও বানোয়াটই ছিল না, তা ছিল পুরোপুরি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রসূত। যার ভিত্তি ছিল গালগল্প আর গুজব। এখানে বিন্দুমাত্র সত্য ছিল না, ছিল না কোনো বিবেচনাবোধ আর নৈতিকতা। পদ্মা সেতু নির্মাণের কোনো ঠিকাদার নিয়োগ হয়নি, কোনো চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নি, কিংবা কোনো অর্থও ছাড় হয়নি, এই পর্যায়ে দুর্নীতির অভিযোগ ছিল বিশ্বব্যাংকের রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের একটি কূটকৌশল মাত্র। পরবর্তী সময়ে দুদকের তদন্ত এবং কানাডার আদালতের রায়ে আমাকে সম্পূর্ণ নির্দোষ বলা হলে বিশ্বব্যাংকের অভিযোগ যে মনগড়া ও অসত্য তা প্রমাণ হয়।

৩.প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে সরকার গঠন করে। আপনাকে যোগাযোগমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়। এরপরই শুরু হয় পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ। প্রথম দিকে কিভাবে কাজ এগিয়ে নিয়েছিলেন?

উত্তর: পদ্মা সেতু নির্মাণ ছিল মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক অঙ্গীকার। তাই যোগাযোগমন্ত্রী নিযুক্ত হওয়ার প্রথম দিন থেকে আমি পদ্মা সেতু নির্মাণে মনোযোগী হই। পরামর্শ নিয়োগ প্রক্রিয়া, পরামর্শক নিয়োগে দরপত্র আহ্বান, মূল সেতুর প্রাক-যোগ্য দরপত্র আহ্বান এবং সেতুর অর্থায়ন সংস্থা- বিশ্বব্যাংক, জাপানের জাইকা, ইসলামি উন্নয়ন সংস্থা এবং এডিবির সঙ্গে ঋণচুক্তি স্বাক্ষরের উদ্যোগ নিই। স্বল্প সময়ে ভূমি অধিগ্রহণ করি। ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া, ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনসহ যাবতীয় কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে নিয়ে আসি। এমনকি প্রাকযোগ্য দরদাতা নির্বাচন প্রক্রিয়াও শেষ করি। যেখানে বঙ্গবন্ধু সেতুর প্রস্তুতি কাজ করতে ১০ বছর লেগেছে, সেখানে মাত্র দুবছরে আমরা পদ্মা সেতুর প্রস্তুতি কাজ শেষ করেছি। ২০১৩ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বরে সেতুর কাজ শেষ হবে, এটাই ছিল আমার মূল টার্গেট। এ টার্গেট নিয়েই দ্রুততার সঙ্গে আমি কাজ এগিয়ে নিতে সচেষ্ট ছিলাম। এ পর্যায়ে বিশ্বব্যাংক, এডিবি, জাইকা ও আইডিবি’র নিকট পদ্মা সেতুর পুনর্বাসন প্রকল্প ও কাজের অগ্রগতি প্রশংসিত হয়। কাজের দ্রুত অগ্রগতি, গুনগতমান এবং স্বচ্ছতা দেখে সবাই মুগ্ধ হয়।

৪।বিশ্বব্যাংক সম্ভাব্য দুর্নীতির অভিযোগ আনে, আপনাকেও অভিযুক্ত করা হয়। মন্ত্রিত্ব থেকে আপনি সরে দাঁড়ান। যদিও বিশ্বব্যাংকের অভিযোগ আদালতে প্রমাণ হয়নি। এসব বিষয়ে কিছু বলবেন কি?

উত্তর:সব ডোনার এজেন্সির কো-অর্ডিনেটরের ভূমিকায় ছিল বিশ্বব্যাংক। তাই বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুর প্রস্তুতি কাজের প্রত্যেক পর্যায় অবলোকন ও অনুমোদন করে। পরামর্শক ও ঠিকাদার নিয়োগের প্রতিটি পর্যায় বিশ্বব্যাংকের অনুমোদনে অগ্রসর হয়। অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরীর নেতৃত্বে কারিগরি কমিটি ঠিকাদার নিয়োগ ও কনসালট্যান্ট নিয়োগের কার্যক্রম এগিয়ে নিচ্ছিল। আমি আগেই বলেছি, প্রাক-যোগ্য ঠিকাদার নির্বাচনের এক পর্যায়ে বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুর, কারিগরি কমিটিকে একটি প্রাক-যোগ্য Qualified ঠিকাদারকে বিশ্বব্যাংকের কালো তালিকাভুক্ত থাকার কারণে বাদ দিতে বলে এবং একটি প্রাক-যোগ্যতায় Disqualified ঠিকাদারকে Qualify করতে বলে। কারিগরি কমিটি প্রাক-যোগ্যDisqualified দরদাতাকে বিশ্বব্যাংকের কালো তালিকাভুক্তির কারণে বাদ দেয়। কিন্তু প্রাক-যোগ্য Disqualified দরদাতাকে যোগ্য করার বারবার অনুরোধ করা সত্বেও দরদাতা কোম্পানির অভিজ্ঞতার জাল সার্টিফিকেট দেওয়ায় Qualify করতে অস্বীকৃতি জানায়। এরপরই তারা পদ্মা সেতুর কার্যক্রমে বাধা দিতে থাকে এবং নানা কর্নার থেকে অসত্য ও ভিত্তিহীন অভিযোগ উত্থাপন করে। উদ্দেশ্য, পদ্মা সেতুর বাস্তবায়ন বিলম্বিত করা।

বিশ্ব ব্যাংক সোজা পথে তাদের উদ্দেশ্য সফল করতে না পেরে পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া বিলম্বিত করার নানামুখী অসৎ কর্মকাণ্ডের আশ্রয় নেয়। আমার বিরুদ্ধে দেশে নানা প্রোপাগান্ডা শুরু করে। প্রাক-যোগ্য দরদাতা প্রতিষ্ঠানের স্থানীয় এজেন্ট দিয়ে, স্থানীয় পত্রিকাকে প্রভাবিত করে, ভুয়া অভিযোগ দাঁড় করায় এবং পত্রিকায় প্রকাশ করে। যোগাযোগমন্ত্রীর অফিস মেরামত ও গাড়ি ক্রয়, কালকিনিতে ট্যাক্স প্রদত্ত অর্থে নির্মিত বাড়ি নিয়ে, সড়ক দুর্ঘটনাকে পুঁজি করে, ১/১১-এর বিভীষিকাময় দিনে অন্যায়ভাবে দুর্নীতিবাজ বানানোর কথা একাধারে নিউজ করায়। এসব পত্রিকার পেপার কাটিং বিশ্বব্যাংকে পাঠানো হয় ইংরেজি অনুবাদ করে। এভাবে বিশ্বব্যাংক পত্রিকার তথাকথিত অসত্য ও ভিত্তিহীন রিপোর্টের ভিত্তিতে আমার ব্যক্তিগত ইন্টিগ্রিটি নিয়ে প্রশ্ন তোলে এবং সে আলোকে বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশের প্রতিনিধি মিস গোল্ড স্টেইন আমাকে সেতু নির্মাণ কার্যক্রম ধীরগতিতে এগিয়ে নেওয়ার অনুরোধ করেন। এক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংকের পদ্মা সেতুর সমন্বয়ক পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত জনৈক বিহারি এই ষড়যন্ত্রে সংশ্লিষ্ট ছিল বলে আমার মনে হয়েছে।

আমি যোগাযোগমন্ত্রীর পদ থেকে সরে আসার পরও বিশ্বব্যাংক অর্থায়নে এগিয়ে আসেনি। বিশ্বব্যাংক আমাকে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দেওয়ার জন্য সরকারের ওপর অন্যায় চাপ দেয়। এবং পদ্মা সেতুতে মিথ্যা দুর্নীতির অভিযোগকে সামনে এনে নিজেদের মুখ রক্ষার জন্য বিশ্বব্যাংকের তিন সদস্যের বিশেষজ্ঞ প্যানেল চেয়ারম্যান আইনজ্ঞ লুইস মোরেনো ওকাম্পোকে ঢাকায় পাঠায়। ওকাম্পো ঢাকায় এসে প্রথমেই কাদের সাথে, কোন কোন সম্পাদকের সাথে বৈঠক করেছেন তা গণমাধ্যম জানে। দুদকের সঙ্গে বৈঠকে বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধি ওকাম্পো আমার বিরুদ্ধে পদ্মা সেতুর কার্যক্রমে কোনো দুর্নীতি প্রমাণ দিতে ব্যর্থ হয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা ড. মশিউর রহমান, তৎকালীন সেতু বিভাগের সচিব এবং আমাকে অ্যারেস্ট করার কথা বলে। আমাকে মন্ত্রিসভা থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য তৎকালীন অর্থমন্ত্রীকে বারবার অনুরোধ করেন। সার্বিক বিবেচনায়, দেশের স্বার্থে, পদ্মা সেতুর স্বার্থে আমি নিজেই মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করি। তারপরও বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুর অর্থায়ন স্থগিত করার ঘোষণা দেয়।

৫. আপনি যে পরিকল্পনা নিয়ে কাজ এগিয়ে নিচ্ছিলেন- আপনার অনুপস্থিতিতে একইভাবে সে কাজ এগিয়েছে। পদ্মা সেতুর নির্মাণে আপনার সার্বিক মূল্যায়ন কি?

উত্তর:আমি যে পরিকল্পনা নিয়ে কাজ এগিয়ে নিচ্ছিলাম তাতে ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে পদ্মা সেতু চালু হতো। এখন ৯ বছর পর পদ্মা সেতু চালু হলো। পদ্মা সেতু নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত হবে- প্রধানমন্ত্রীর এ ঘোষণার পরও অহেতুক মালয়েশিয়ার বিনিয়োগ নিয়ে অনেক সময় ক্ষেপণ করা হয়েছে। এছাড়া মূল সেতুর দরদাতা নির্বাচনে আমার রেখে আসা প্রাক-যোগ্য একজন বিডারকে বিশ্বব্যাংকের পরামর্শে বাদ দিয়ে পদ্মা সেতুর ঠিকাদার, আমার রেখে যাওয়া প্রি-কোয়ালিফাইড বিডারদের মধ্যে থেকে নির্বাচন করা হলো। কিন্তু সুপারভিশন কনসালটেন্ট নিয়োগে নতুনভাবে প্রি-কোয়ালিফিকেশন আহবান করা হলো। অথচ এসএনসি-লাভালিনকে বাদ দিয়ে অন্যদের মধ্য থেকে সুপারভিশন কনসালটেন্ট নির্বাচন করা সমীচীন ছিল। কারণ, এর জন্যও সময় ক্ষেপণ করেছে। নতুনভাবে প্রি-কোয়ালিফিকেশন দরপত্র আহবানের ফলে কোরিয়ার মতো তুলনামূলকভাবে অনভিজ্ঞ সুপারভিশন কনসালটেন্ট নিয়োগ পেল। যদি নতুন প্রি-কোয়ালিফাইড টেন্ডার আহবান না করে পূর্বের দ্বিতীয় সর্বনিম্ন প্রি-কোয়ালিফাইড বিডার মনসেল-এইকম (Maunsell -AECOM)) নির্বাচিত হতো তাহলে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো না। এক্ষেত্রে ঠিকাদার নিয়োগে এক নীতি এবং সুপারভিশন কনসালটেন্ট নিয়োগের ক্ষেত্রে অন্য নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। ফলে সময়ক্ষেপণ ও নির্মাণ ব্যয় দুটোই বেড়ে গেছে। যখন নির্মাণ পর্যায়ে দেখা গেল নদীর তলদেশে শক্ত মাটি নেই- আছে তরল কাদা যা পাইলিং-এর উপযুক্ত নয়। তখন বর্তমান ঠিকাদার, যারা নির্মাণ কাজে অভিজ্ঞ, তারা ক্যামিক্যাল ব্যবহার করে মাটি শক্ত করে পাইলিং করার পরামর্শ দেয়। তাদের এ পরামর্শ আমার আগের পরামর্শের সঙ্গে মিল ছিল। কিন্তু অনভিজ্ঞ কনসালটেন্ট সে পথে না গিয়ে গবেষণার নামে দুই বছর সময়ক্ষেপণ করল। ঠিকাদারের সেই পরামর্শ অনুযায়ীই বর্তমানে স্ক্রিন গ্রাউটিং পদ্ধতিতে ক্যামিক্যাল ব্যবহারের পথ বেছে নিল। ফলে সেতু নির্মাণে আরো দু’বছর সময়ক্ষেপণ হলো। ব্যয়ও বেড়ে গেল অনেক।

নিজের টাকায় আমরা পদ্মা সেতু নির্মাণ করছি- এটা গর্বের। তবে আমাদের যে এতো অর্থ নেই- তাও ঠিক। পদ্মা সেতু নির্মাণের জন্য আমাদের অনেক বিনিয়োগ রিসিডিউল করতে হয়েছে। বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন থেকে সরে গেলে আমার পরিকল্পনা ছিল: ডিজাইন বিল্ট ফাইনানসিং-এ পদ্মা সেতু নির্মাণ করার। এ সম্পর্কিত সার-সংক্ষেপ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করি। তিনি অনুমোদন দেন। কিন্তু অর্থমন্ত্রী বিশ্বব্যাংকে ফিরিয়ে আনতে বিভিন্ন কৌশল গ্রহণ করেন। সে সময় পদ্মা সেতু ডিজাইন বিল্ট ফাইনানসিং করা সম্ভব হলে সরকারি অর্থের উপর চাপ পড়ত না। ডিজাইন বিল্ট ফাইনানসিং- এ গেলে খরচ কম হতো। কারণ, এক্ষেত্রে আমাদের নিজস্ব অর্থ বিনিয়োগ করতে হতো না। আমরা Bidders Financing বা PPP-তে পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন করতে পারতাম।

৬. আপনার নেতৃত্বেই পদ্মা সেতু নির্মিত হওয়ার কথা। কানাডার আদালত ও দুদকের আপনার প্রতি অভিযোগের সত্যতা মিলেনি। বিষয়টি খোলাস করে বলুন?

উত্তর:দেশের গণমাধ্যম পদ্মা সেতুর দুর্নীতির অসত্য ও ভুয়া খবরকে উপজীব্য করে আমার বিরুদ্ধে ঢালাও প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। বেনামি চিঠির ভিত্তিতে বারবার একই বিষয়ে প্রতিবেদন করেছে। চ্যানেলগুলোয় খবরের কাগজগুলোর রিপোর্টকে উপজীব্য করে টকশোতে বুদ্ধিজীবীরা অবিবেচকের মতো অশোভন কথা বলেছে। শোনা কথার ওপর নির্ভর করে বিবেচনাহীনের মতো অসত্য কথাকে ছড়িয়ে দিয়েছে। পত্রিকা প্রতিবেদন তৈরির সময় সত্য-মিথ্যা যাচাই করেনি। কীভাবে, সঠিক পথে পদ্মা সেতুর কাজ এগিয়েছে তা তারা জানারও চেষ্টা করেনি। এ বিষয়ে তাদের ন্যূনতম জ্ঞানও ছিল না। তবু এমনভাবে কথা বলেছে যেন তারা বিশেষজ্ঞ।

আবার পত্রিকাগুলো কারিগরি কমিটির মূল্যায়নে কোন অনিয়ম হয়েছে- এ বিষয়ও কিছু বলেনি। প্রাক-যোগ্য ঠিকাদার নিয়োগে কারিগরি কমিটিই- এনটিটি। আমি শুধু কারিগরি কমিটির সিদ্ধান্তকে বিশ্বব্যাংকে অগ্রায়ন করেছি। বাতাসের ওপর ভর করে আমার বিরুদ্ধে নানা অসত্য রিপোর্টকে পুঁজি করে পদ্মা সেতু নির্মাণের কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করেছে। নানা কারণে প্রভাবিত হয়ে বিশ্বব্যাংকের ষড়যন্ত্রে হাত মেলাতে গিয়ে একবারও ভাবেনি পদ্মা সেতু দেশীয় সম্পদ। এর বাস্তবায়ন অসত্য ও ভিত্তিহীন অজুহাতে বাধাগ্রস্ত হলে দেশের ক্ষতি হবে। অনেক সময় ভাবি, দেশের পত্রিকাগুলো কি ষড়যন্ত্রের সাথে আপস করে, কিন্তু কেন? তারা এদেশের সন্তান। তাহলে আমাকে অসত্য ও ভিত্তিহীন অজুহাতে নাজেহাল করতে গিয়ে দেশের ক্ষতি হচ্ছে- এটা কি তারা বুঝতে অক্ষম ছিলেন? ষড়যন্ত্রকারীরা ২০১৩ সালে ডিসেম্বরে আওয়ামী লীগ সরকার যাতে পদ্মা সেতু নির্মাণ শেষ করতে না পারে এবং পদ্মা সেতু বাস্তবায়নের ‘বিজয় নিশান’ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে না ওড়ে- সে ব্যবস্থাই পাকাপোক্ত করেছিল।

আমি প্রায় তিন বছর যোগাযোগমন্ত্রী ছিলাম। তিন বছর আমি প্রচুর পরিশ্রম করেছি। সরকারি প্রকল্পের জন্য প্রচুর বৈদেশিক সাহায্য মবিলাইজ করেছি। যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সড়ক বিভাগ, সেতু বিভাগ এবং বর্তমান রেল মন্ত্রণালয়ের উন্নয়নে নানা কার্যক্রম গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করেছি। আমি যখন দায়িত্ব নিই, তখন সেতু বিভাগের বঙ্গবন্ধু সেতুর টোল আদায় করা ছাড়া কোনো কাজ ছিল না। আমি দায়িত্বে এসে সেতু বিভাগের কার্যক্রমে গতি সঞ্চার করি।

মাওয়া-জাজিরা পয়েন্টে পদ্মা সেতু নির্মাণ, ঢাকা-এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ, ঢাকা ও চট্টগ্রামে টানেল নির্মাণ, গুলিস্তান লেচু শাহের মাজার হতে দ্বিতীয় বুড়িগঙ্গা সেতু পর্যন্ত ফ্লাইওভার নির্মাণ, পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া পয়েন্টে দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণসহ ১১টি প্রকল্প গ্রহণ ও কিছু কিছু প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়ন শুরু করি। আমি যোগাযোগমন্ত্রী থাকলে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া পয়েন্টেও দ্বিতীয় পদ্মা সেতু এতদিনে বাস্তবায়িত হতো। এ বিষয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিডারস ফাইনান্সিং-এ সেতু নির্মাণের সারসংক্ষেপ অনুমোদন দিয়েছিলেন। সড়ক বিভাগের অধীনে ১৬০টি প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয় যার মধ্যে ৪৪টি অগ্রাধিকার প্রকল্প। অনুরূপভাবে রেলওয়ের উন্নয়নে ৪৪টি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর অনেকগুলোর কাজ বাস্তবায়নাধীন ছিল।

আমি জোর দিয়ে বলতে পারি, যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে আমি তিন বছরে যে কাজ করে দিয়ে এসেছি, যেসব প্রকল্প হাতে নিয়েছি, সেসব প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে, অগ্রগতি হয়েছে, সে কাজ ১০০ বছরের ভেতরে পাঁচ বছর মেয়াদি কোনো সরকার উদ্যোগ নিতে পারেনি। যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে আমি সেসব প্রকল্প গ্রহণ করেছি, বাস্তবায়ন করেছি তা হবে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জন্য একটি মাইল ফলক এবং একটি ঐতিহাসিক দলিল।

৭. বিশ্বব্যাংক আপনাকে কেন টার্গেট করেছিল?

উত্তর:আওয়ামী লীগের আমলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত দিয়ে যাতে পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন না হয়- এটাই ছিল ষড়যন্ত্রকারীদের টার্গেট। তাই যোগাযোগ মন্ত্রী হিসেবে তারা আমাকে টার্গেট করেছিল। আমাকে হেয় প্রতিপন্ন করে সরকারকে বিপদে ফেলার চেষ্টা করেছে। প্রধানমন্ত্রী যদি পর পর তিনবার নির্বাচিত না হতেন প্রধানমন্ত্রী তাহলে এ পদ্মা সেতু বাস্তবায়িত হতো না।

৮. পদ্মা সেতু অর্থায়ন বন্ধ করা ছিল বিশ্বব্যাংকের ভুল সিদ্ধান্ত- বিস্তারিত বলুন?

উত্তর:একথা সত্যি, পদ্মা সেতুতে অর্থায়ন বন্ধ করা ছিল বিশ্বব্যাংকের একটি চরম ভুল সিদ্ধান্ত। এই ভুল সিদ্ধান্তের কারণে বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুর মতো একটি বড়ো প্রকল্পে অর্থায়নের সুযোগ হারালো। বিশ্বব্যাংকের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রবার্ট জোয়েলিক বিশ্বব্যাংকের বোর্ড সভায় আলোচনা না করে এবং বোর্ড সভার অনুমোদন না নিয়েই, নিজ উদ্যোগে কারও অন্যায্য নির্দেশে প্রভাবিত হয়ে পদ্মা সেতুর অর্থায়ন স্থগিত করেছিলেন। বিশ্বব্যাংকের অধিকাংশ কর্মকর্তাই অর্থায়ন স্থগিতের বিষয় সমর্থন করেননি। বিশ্বব্যাংকের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রবার্ট জোয়েলিকের সাথে চায়নায় বোয়াও ফোরামে এক অনুষ্ঠানে আমার সাক্ষাৎ ও পরিচয় হয়। তখন তিনি পদ্মা সেতুর অর্থায়ন বাতিল করার বিষয়ে দুঃখ প্রকাশ করেন। তখন আমি নিশ্চিত হই যে, তিনি কারো দ্বারা প্রভাবিত হয়ে এমন অনৈতিক কাজ করেছেন। রবার্ট জোয়েলিকের মতো বিশ্বব্যাংকের হাতে গোনা কিছু কর্মকর্তার ষড়যন্ত্রের কারণে পদ্মা সেতু অর্থায়ন না করার দায় বিশ্বব্যাংককে নিতে হলো। আমি মনে করি, বিশ্বব্যাংক সৃষ্টির পর থেকে আরো ১০০ বছরেও পদ্মা সেতুর মতো মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের সুযোগ বিশ্বব্যাংক পাবে না।

বিশ্বব্যাংকের সেই রবার্ট জোয়েলিক এখন কোথায়? মিস গোল্ড স্টেইন এখন কোথায়? সেই লুইস ওকাম্পো কোথায়? ওকাম্পোর দুর্নীতিবাজ হিসেবে অভিযুক্ত হয়েছে। এ খবর দেশ-বিদেশের পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। অথচ ওকাম্পো বাংলাদেশে এসে সততার নাটক করেছে। মূলত বিশ্বব্যাংকের বিশেষজ্ঞ প্যানেলের প্রধান লুইস মোরেনো ওকাম্পোর নেতিবাচক রিপোর্টে বাংলাদেশের স্বপ্ন পদ্মা সেতুর অর্থায়ন থেকে বিশ্বব্যাংক সরে যায়। অথচ ওকাম্পো আজ বিশ্বের বড় দুর্নীতিবাজ হিসেবে চিহ্নিত। ওকাম্পোর দুর্নীতির চল্লিশ হাজার নথি ইতিমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। ওকাম্পোর নেতিবাচক রিপোর্ট পদ্মা সেতু নিয়ে বাংলাদেশকে এবং আমাকে বিতর্কিত ও সমালোচিত করেছে। তৎকালীন যোগাযোগমন্ত্রী হিসেবে আমার সততাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এই দুর্নীতিবাজ ওকাম্পোর পরামর্শেই বিশ্বব্যাংক গ্লোবাল সার্চ করে আমার সম্পর্কে কোন অনিয়ম পায়নি। বিশ্বব্যাংক আজ পদ্মা সেতুর অর্থায়ন করতে না পেরে বিশ্বব্যাপী লজ্জিত। আমার কাছে অনুতপ্ত। সেই উদ্ধতবাদী ওকাম্পো আজ বিশ্বব্যাপী নিন্দিত ও বিতর্কিত। তার সাথে বাংলাদেশের কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি বৈঠক করে তার অপচেষ্টার সাথী হয়েছিলেন। দুদকের তৎকালীন একজন কমিশনার মিডিয়ায় একাধিকবার একথা প্রকাশ করেছেন। আল্লাহ সর্বশক্তিমান। আজ সত্য প্রকাশিত হয়েছে। আমি নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছি।

৯. দরপত্রে কমিশন নিয়ে আপনার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিষয়টি খোলাখুলি যদি বলতেন?

উত্তর:রমেশ শাহের ডায়রিতে নাকি ‘এম’ ((M)) লেখা ছিল। ‘এম’ মানে করা হয়েছিল মিনিস্টার। আমি তখন ছিলাম যোগাযোগমন্ত্রী। ‘এম’ দিয়ে অনেক কিছু হতে পারে। বিশ^ব্যাংক বলছে, এটি নাকি আমার সাংকেতিক নাম। কী উদ্ভট অপকল্পনা, কী হাস্যকর ভাবনা! আসলে M-বর্ণ দিয়ে কী আমাকে না কি অন্য কাউকে ইঙ্গিত করেছে কিংবা রমেশ শাহর ডায়রিতে আদৌ এমন কিছু ছিল কি না তা নিশ্চিত নয়। অবশ্য শেষ পর্যন্ত কানাডার আদালত এসব বিষয়কে গালগল্প বলে রায় দিয়েছে। M দিয়ে আমাকে ইঙ্গিত করা হলেও রমেশ শাহ কী কারণে অন্তর্ভুক্ত করেছেন- তা আমার জানা নেই। রমেশ শাহর ডায়ারিতে লেখা- ‘পিসিসি’ তিনি কী উদ্দেশ্যে লিখেছেন তা তিনি নিজেই জানেন।

আমার সঙ্গে রমেশ শাহ বা অন্য কারো সঙ্গে অনৈতিক কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়নি। আমি তাদের কারো সঙ্গে এককভাবে কথা বলিনি, দেখাও করিনি। আমাকে সম্পৃক্ত করে এ ধরনের লেখা, যদি আদৌ থেকে থাকে, তা অসত্য, অন্যায় এবং অযৌক্তিক। রমেশ শাহকে জিজ্ঞাসাবাদ ব্যতিরেকে কল্পিত ডায়ারির বিষয়টি সঠিক ও সত্য ধরে নিয়ে আমার বিরুদ্ধে আনা কোনো অভিযোগই আইনের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য ছিল না। এক্ষেত্রে, কথিত ডায়ারির কপি, রমেশ শাহ’র বক্তব্য এবং তার সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক আছে কিনাÑ তা পরীক্ষা-সহ পারিপার্শ্বিক অন্যান্য বিষয়াবলী অনুসন্ধান করে প্রকৃত তথ্য উদ্ঘাটন করা উচিত ছিল। বিশ^ব্যাংক তা না করে নানা উপায়ে আমাকে অপদস্থ করে ও দোষী বানিয়ে পক্ষান্তরে পদ্মা সেতুর কাজকে ব্যাহত করতে চেয়েছিল। এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারকে ব্যর্থ করতে চেয়েছিল।

১০. প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা লন্ডনে বলেছিলেন, “সৈয়দ আবুল হোসেন প্রকৃত দেশপ্রেমিক”। এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য কি?

উত্তর: সূচনালগ্নে পদ্মা সেতু নির্মাণ-বিষয়ক প্রয়োজনীয় সকল প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রমে আমি সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছি। কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতিকে বিন্দুবৎ প্রশ্রয় দেইনি। এমনটি আমার বোধেও কখনো আসেনি। পদ্মা সেতু সম্পন্ন করতে পারলে আমার যে সম্মান হবে, পদ্মা সেতুর মতো কালজয়ী স্থাপনার সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে সুচারুভাবে তা সম্পাদন করা সম্ভব হলে যে ইতিহাস সৃজন হবে তা পৃথিবীর সমগ্র ঐশ্বর্যের চেয়েও আমার কাছে বেশি মূল্যবান ছিল। সেখানে আমি কয়েক লাখ ডলারের দুর্নীতি করবÑ এমন বোধ-বিশ^াস অপবাদকারী কিংবা দেশীয় অপপ্রচারকারী বা বিশ্বাসকারীদের কীভাবে হলো তা ভাবলে আমার হাসি পায়।

২০১৩ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বরের মধ্যে পদ্মা সেতুর কাজ সমাপ্ত করার উদ্দেশ্যকে মনেপ্রাণে ধারণ করে দুই বছরের মধ্যে যাবতীয় প্রস্তুতিকাজ শেষ পর্যায়ে নিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু বিশ্বব্যাংকের পরিকল্পিত ও অসত্য অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে দেশের স্বার্থে, পদ্মা সেতুর স্বার্থে এবং বিশ্বব্যাংকের অর্থপ্রাপ্তির প্রত্যাশায় মন্ত্রিসভা থেকে ২০১২ খ্রিষ্টাব্দের ২৩শে জুলাই পদত্যাগ করি। এরপরও বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুর অর্থায়নে ফিরে আসেনি। পূর্বেই বলেছি, পুরো পৃথিবীর সমস্ত সম্পদ দিয়েও পদ্মা সেতু বিষয়ে আমাকে আমার সততা থেকে একবিন্দু নড়াতে পারত না। এটি কেউ বিশ^াস করুক বা না করুক, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিশ্বাস করেছিলেন। তাই এসময় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী লন্ডনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন, “সৈয়দ আবুল হোসেন প্রকৃত দেশপ্রেমিক। তিনি দেশের স্বার্থেই মন্ত্রীত্ব ছেড়ে দিয়েছেন। বিশ্বব্যাংক ঋণ দিক আর না দিক- সরকার পদ্মা সেতু নির্মাণের কাজ পরিকল্পনা অনুযায়ী এগিয়ে নেবে।” আমার প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এমন উঁচুমানের ইতিবাচক ধারণার প্রকাশ্য স্বীকৃতি আমার জীবনে পাওয়া সেরা উপহার এবং সেরাপ্রাপ্তি। এজন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আমি চিরঋণী। কথাটি মনে পড়লে আমি তাঁর মহানুভব স্বীকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতা-আপ্লুত অনুভাবনায় মিথ্যা অপবাদের সব কষ্ট ভুলে যাই।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পর রাজনীতিবিদ এইচএম এরশাদ, বি. চৌধুরী, বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী এবং সাবেক অর্থমন্ত্রী এমএ মুহিত আমার সততার জন্য প্রশংসা করেছেন।

১১. যারা পদ্মা সেতু নিয়ে বিরোধিতা করে আপনার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছিলেন- তাদের উদ্দেশ্যে আপনার বক্তব্য কি?

উত্তরঃ পদ্মা সেতু বাংলাদেশের মানুষের স্বপ্ন। আর বাংলাদেশের মানুষের স্বপ্নপূরণের এই পদ্মা সেতু মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর শ্রেষ্ঠ উপহার। এ স্বপ্নের পদ্মা সেতু বাস্তবায়নে শতভাগ সততা ও আন্তরিকতা নিয়ে আমি প্রস্তুতিপর্বে দিনরাত কাজ করেছি। এতে আমি কোন অনিয়ম করিনি। এতদসত্বেও বিশ্বব্যাংক, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রকারীরা যে অপবাদ আমাকে দিয়েছে তা ছিল অসত্য। আজ সকল অপবাদ ও অপমানের জবাব দিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে পদ্মা সেতু দৃশ্যমান। পদ্মার দু’পাড়কে যুক্ত করে পদ্মা সেতু শুধু সমগ্র বাংলাদেশ নয়, এশিয়াসহ ইউরোপে যাওয়ার পথ খুলে দিয়েছে। পদ্মা সেতু বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নয়নের প্রতীক। আমাদের গর্ব ও অহংকারের প্রতীক। সক্ষমতার প্রতীক। পদ্মা সেতু আমাদের আত্মবিশ্বাসের প্রতীক। বিশ্বব্যাংকের প্রতি সমুচিত জবাবের প্রতীক। পদ্মা সেতু সততার প্রতীক। আসুন, আমরা জাতি-ধর্ম ও দলমত নির্বিশেষে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উন্নয়নের হাতকে শক্তিশালী করি এবং সততা, নিষ্ঠা, দেশপ্রেম ও আন্তরিকতার সাথে দেশের উন্নয়নে আত্মনিয়োগ করি।

দেশটিভি/এএম
দেশ-বিদেশের সকল তাৎক্ষণিক সংবাদ, দেশ টিভির জনপ্রিয় সব নাটক ও অনুষ্ঠান দেখতে, সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল:

এছাড়াও রয়েছে

শিক্ষকদের ওপর হামলার ঘটনায় ইউনিসেফের উদ্বেগ-নিন্দা

তদারকির গাফিলতিতেই সীতাকুণ্ডে অগ্নিকাণ্ড, বললো তদন্ত কমিটি

ডেঙ্গুতে আরও ৩২ জন হাসপাতালে

সচিব হলেন ৩ কর্মকর্তা, ৩ সচিবের দফরত বদল

কোরবানির পশুবাহী যানবাহনে চাঁদাবাজি বরদাশত করা হবে না: আইজিপি

ভরিতে স্বর্ণের দাম কমলো ১১৬৬ টাকা

ঈদে নৌপথেও মোটরসাইকেল নিষিদ্ধ

স্ত্রীসহ দুই দিনের রিমান্ডে হেনোলাক্স গ্রুপের মালিক

সর্বশেষ খবর

  • আগাম নির্বাচনের দাবি প্রত্যাখ্যান বরিস জনসনের

    -১৬৭৯৮ সেকেন্ড আগে
    আগাম নির্বাচনের দাবি প্রত্যাখ্যান বরিস জনসনের
  • শিক্ষকদের ওপর হামলার ঘটনায় ইউনিসেফের উদ্বেগ-নিন্দা

    -১৪৫৩৭ সেকেন্ড আগে
    শিক্ষকদের ওপর হামলার ঘটনায় ইউনিসেফের উদ্বেগ-নিন্দা
  • গাজীপুরে বসত ঘরে মিললো গৃহবধূর লাশ

    -১২৮৮২ সেকেন্ড আগে
    গাজীপুরে বসত ঘরে মিললো গৃহবধূর লাশ
  • সরকারের অব্যবস্থাপনায় বিদ্যুতের সংকট: জাফরুল্লাহ

    -১০৯৬৭ সেকেন্ড আগে
    সরকারের অব্যবস্থাপনায় বিদ্যুতের সংকট: জাফরুল্লাহ
  • তদারকির গাফিলতিতেই সীতাকুণ্ডে অগ্নিকাণ্ড, বললো তদন্ত কমিটি

    -৯২৩৬ সেকেন্ড আগে
    তদারকির গাফিলতিতেই সীতাকুণ্ডে অগ্নিকাণ্ড, বললো তদন্ত কমিটি

সর্বশেষ খবর

আগাম নির্বাচনের দাবি প্রত্যাখ্যান বরিস জনসনের

শিক্ষকদের ওপর হামলার ঘটনায় ইউনিসেফের উদ্বেগ-নিন্দা

গাজীপুরে বসত ঘরে মিললো গৃহবধূর লাশ

সরকারের অব্যবস্থাপনায় বিদ্যুতের সংকট: জাফরুল্লাহ