বন্যায় লাখ লাখ মানুষ পানিবন্দি

বুধবার, ১৬ আগস্ট, ২০১৭ (১৮:৫৮)
বন্যায়-লাখ-লাখ-মানুষ-পানিবন্দি

বন্যায় লাখ লাখ মানুষ পানিবন্দি

ব্রহ্মপুত্র, ধরলা ও যমুনাসহ প্রধান নদ-নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে সারাদেশে বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। এতে পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন লাখ লাখ মানুষ।

ব্রহ্মপুত্রের পানি নুনখাওয়া পয়েন্টে বিপদসীমার ৩ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে ও চিলমারী পয়েন্টে বিপদসীমার ৭৯ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে শেরপুর সদর উপজেলার চর পক্ষীমারি, কামরের চর ও চর মোচারিয়া ইউনিয়নের অন্তত ২৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।

তলিয়ে গেছে, রোপা আমনসহ ফসলের ক্ষেত। কুড়িগ্রামে ধরলার পানি বিপদসীমার ৭৬ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে বইছে। এছাড়া যমুনার পানি বাহাদুরাবাদ, সারিয়াকান্দি, কাজীপুর, সিরাজগঞ্জ ও আরিচা পয়েন্টে বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে লাখ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

বন্যার পানিতে রেললাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় জামালপুর-তারাকান্দি রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে।

নেত্রকোণা: দুই জনের মৃত্যু , তিন নদীর পানি বিপদসীমার উপরে।

নেত্রকোণায় বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। নতুন করে এলাকা প্লাবিত না হলেও এখনও প্রায় সোয়া লাখ মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন। কংস, উব্দাখালি ও দনু নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে বইছে। বানের পানিতে পড়ে গিয়ে মঙ্গলবার এক বৃদ্ধ ও পনির তোড়ে হেলে যাওয়া বিদ্যুতের খুটি থেকে ঝুলন্ত তারে বিদ্যুতস্পর্শে এক ব্যক্তি মারা গেছেন। তাদের দুইজনের বাড়ি কলমাকান্দা উপজেলায়।

দুর্গতদের মাঝে বরাদ্দের ২৫ মেট্রিকটন চাউল ও নগদ একলাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে বলে জানান জেলা প্রশাসক। তবে দুর্গতদের অনেকেই জানিয়েছেন তারা ত্রাণ পাননি।

শেরপুরে:

শেরপুর জেলার পুরাতন ব্রহ্মপুত্রসহ অন্যান্য নদ-নদীর পানি বাড়তে শুরু করেছে। বুধবার ভোর থেকে জেলার পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বাড়ার কারণে নদের বেড়িবাধের ভাঙ্গা অংশ দিয়ে সদর উপজেলার চর পক্ষীমারি, কামরের চর ও চর মোচারিয়া ইউনিয়নের অনন্ত ২৫ গ্রামে পানি প্রবেশ করছে। ফলে এসব এলাকার রোপা আমন ও সবজি ক্ষেত তলিয়ে গেছে। এসব গ্রামের শতশত মানুষ পানি বন্দি হয়ে পড়েছে।

পানি বৃদ্ধির কারণে শেরপুর-জামালপুর-উত্তরবঙ্গ সড়কের চর পক্ষীমারি ইউনিয়নের পোড়ার দোকান নামক স্থানের কজওয়ের (ডাইভারসান) উপর দিয়ে প্রবল বেগে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে যে কোনো সময় ওই সড়কের সকল প্রকার যান চলাচল বন্ধ হয়ে যেতে পারে। পানির তোড়ে ইতিমধ্যে ডাইভারসানের দক্ষিণ প্রান্তের সড়কে গর্ত সৃষ্টি হয়ে পড়ায় ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে শেরপুর-জামালপুর-উত্তর বঙ্গের বিভিন্ন পণ্য ও যাত্রীবাহী যানবাহন। এছাড়া সড়ক ভেঙ্গে যাওয়ায় ধির গতিতে যান চলাচলের কারণে ডাইভারসানে দীর্ঘ যান জটের সৃষ্টি হয়েছে।

শেরপুর পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, ব্রক্ষপুত্র নদের পানি বাড়ছে, শেরপুর ব্রহ্মপুত্র সেতুর নিকটে বিপদসীমা বরাবর পানি প্রবাহিত হচ্ছে।

কুড়িগ্রাম:

কুড়িগ্রামে নদ-নদীর পানি সামান্য হ্রাস পেলেও চিলমারী পয়েন্টে ব্রহ্মপুত্রের বিপদসীমার ৮০ সেন্টিমিটার ও সেতু পয়েন্টে ধরলার পানি বিপদসীমার ৭৭ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির অপরিবর্তিত রয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে ৯ উপজেলার ৬০ ইউনিয়নের ৪ লক্ষাধিক মানুষ। ঘরবাড়ি ছেড়ে বানভাসীরা গবাদি পশুসহ আশ্রয় নিয়েছে পাকা সড়ক, উচু বাধ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। বন্যা দুর্গত এলাকায় খাদ্য ও বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকট দেখা দেয়ায় দুর্ভোগ বেড়েই চলেছে বানভাসীদের।সরকারি বে-সরকারিভাবে সামান্য ত্রাণ তৎপরতা শুরু হলেও তা পৌঁছাতা পারছে না দুর্গম এলাকাগুলোতে। ত্রাণ না পাওয়ার অভিযোগ বন্যা দুর্গত এলাকার বেশির ভাগ মানুষের।

কুড়িগ্রাম-ভুরুঙ্গামারী সড়ক তলিয়ে ৪টি পয়েন্টে ধসে যাওয়ার বন্ধ রয়েছে সোনাহাট স্থল বন্দরসহ নাগেশ্বরী, ভুরুঙ্গামারী ও ফুলবাড়ী উপজেলার যোগাযোগ ব্যবস্থা।

বন্ধ করে দেয়া হয়েছে সাড়ে ৫ শতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠন। তলিয়ে গেছে ৫০ হাজার হেক্টর জমির রোপা আমন ক্ষেত।

এ পর্যন্ত বন্যার্তদের জন্য সাড়ে ১৭ লাখ ৫ হাজার টাকা, ৬শ ৫১ মেট্রিক টন চাল ও ২ হাজার শুকনো খাবার প্যাকেট বরাদ্দ দেয়া হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।

কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডাঃ নজরুল ইসলাম বলেন, গত তিন দিনে বন্যার পানিতে ডুবে ও সাপের কামড়ে ৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছে দুই জন।

জামালপুর :

যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় জামালপুরের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াভহ রূপ নিচ্ছে। বুধবার সকালে বাহাদুরাবাদ পয়েন্টে যমুনার পানি বিপদসীমার ১৩৪ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

যমুনা, ব্রহ্মপুত্রসহ শাখা নদীগুলোর পানি বাড়ছে হু হু করে। বন্যার পানি বৃদ্ধির ফলে জেলার ৭টি উপজেলার ৪০টি ইউনিয়নের প্রায় তিন লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। পানি উঠে পড়ায় জামালপুরের সাথে দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার রেল যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। সেই সাথে মাদারগঞ্জ উপজেলার চাদপুর নাংলা বেড়িবাধ ভেঙে নতুন করে ১৫ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে জেলার ৮১৬টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। তলিয়ে গেছে ৫হাজার হেক্টর জমির রোপা আমন ও বীজতলা। বন্যা দুর্গত এলাকায় কাজ করছে ৭৭টি মেডিকেল টিম।

জামালপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক রাসেল সাবরিন জানিয়েছেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে বন্যা কবলিত এলাকায় ২০টি আশ্রয় কেন্দ্র খোলার পাশাপাশি এ পর্যন্ত ১২৮ মে.টন চাল ও ২ লাখ ১০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

দিনাজপুর:

বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও পানি এখনো বিপদসীমার উপরে। জেলায় মোট ছোট বড় ১৭টি নদী রয়েছে। এর বেশিরভাগ স্বাভাবিক হলেও শহরের মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া পূণর্ভবা নদীর পানি এখনো বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, দিনাজপুর শহরের পাশে পূণর্ভবা নদীর পানি বিপদসীমার ৪০ সে.মি. উপরে অবস্থান করছে। এছাড়াও অন্যান্য উপজেলার নদীর পানি বিপদসীমার ৩ থেকে ৭ সে.মি. নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

শহররক্ষা বাধ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে দ্রুত মেরামতের কাজ চলছে। ভেঙ্গে যাওয়া বাধটির পানি বন্ধ করতে সক্ষম হবে বলে জানিয়েছেন তারা।

সড়ক, মহাসড়ক ও ট্রেনলাইনের উপর পানি উঠায় দিনাজপুর সদরের সাথে ১৩ উপজেলার বাস ও দিনাজপুরের সঙ্গে ঢাকার ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে। ঢাকার অল্প কিছু বাস বিকল্প সড়ক দিয়ে রংপুর হয়ে যাতায়াত করছে।

দিনাজপুর জেলা প্রসাশক জানান, বন্যা কবলিত ৮টি জেলার লক্ষাধিক পরিবার পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন। জেলায় মোট ৩৫০টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে যেখানে ৪৪হাজার পরিবার আশ্রয় নিয়েছে।

এছাড়াও দিনাজপুর সদরসহ ৪টি উপজেলায় মৃতের সংখ্যা দাড়িয়েছে মোট ১৯জন।

নেত্রকোনা: তিন শতাধিক গ্রাম প্লাবিত, লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি, দুই জনের মৃত্যু

নেত্রকোনা জেলায় কয়েকদিনের অতি বর্ষণ আর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে বন্যার পানিতে নেত্রকোনার সাতটি উপজেলার ২৯টি ইউনিয়নের তিন শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলায় বন্যার কারণে দুই জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ।

নিহতরা হলেন-উপজেলার চকপাড়া গ্রামের মকবুল হোসেন ও মন্ডলেরগাতি গ্রামের আব্দুল মন্নানের ছেলে জামাল মিয়া (৫০)।

রাস্তা তলিয়ে নেত্রকোনা-কলমাকান্দা সড়কে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে বিপাকে পড়েছে চলাচলকারীরা। নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। জেলা প্রশাসন থেকে ১লাখ ৬০ হাজার টাকা আর ২৫ মে. টন চাল বিতরণ করা হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের দেয়া ত্রাণ বেশিরভাগ স্থানেই পৌঁছেনি পানিবন্দি দুর্গত মানুষের কাছে।

জেলা প্রশাসনের হিসেবে সাড়ে ৩১ হাজার পরিবারের প্রায় সোয়া লাখ মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় দুর্ভোগে আছেন। দেড় হাজার হেক্টর রোপা আমন বোনা জমি তলিয়ে গেছে। ডুবে গেছে অসংখ্য পুকুরসহ মাছের ঘেরসহ শাকসবজি খেত। পানি ঢুকে পড়ায় বন্ধ হয়ে গেছে প্রায় ৩ শতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।

বানের পানিতে তলিয়েছে গেছে ১০ হাজার ২৫ হেক্টর রোপা আমন জমি। এ ছাড়াও সোয়া দুইশো হেক্টরের বেশি আমন বীজতলা তলিয়ে গেছে। কংস নদের পানি বিপদসীমার ১৬০ সেন্টিমিটার, উব্দাখালি ৯৪ সেন্টিমিটার ও ধনু নদীর পানি ৩৬ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে বইছে।

এছাড়াও মৌলভীবাজারে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে।

এই ক্যাটাগরীর আরও খবর

আশাশুনিতে আ’লীগের নেতা খুন

কুড়িগ্রাম-পিরোজপুরে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৫

রোহিঙ্গা সংকট: এশিয়া-ইউরোপ সম্মেলনে কথা বলবেন ইইউসহ ৩ দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা

ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক নষ্ট করতেই হিন্দু বাড়িতে হামলা: কাদের

রাবির অপহৃত ছাত্রী উদ্ধার

রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করলেন মার্কিন সিনেটর- কংগ্রেসম্যানরা